প্রতিবেদক - | বৃহস্পতিবার, ২০২৬ জানুয়ারী ০৮, ০৯:০৪ অপরাহ্ন
বুদ্ধ মহাধাতু চৈত্যে ৫০০ জন গণ প্রব্রজ্যা ও কঠিন চীবর দান সম্পন্ন: এক অনন্য আধ্যাত্মিক মহাযজ্ঞ
বুদ্ধ মহাধাতু চৈত্যে ৫০০ জন গণ প্রব্রজ্যা ও কঠিন চীবর দান সম্পন্ন: এক অনন্য আধ্যাত্মিক মহাযজ্ঞ

বুদ্ধ মহাধাতু চৈত্যে ৫০০ জন গণ প্রব্রজ্যা ও কঠিন চীবর দান সম্পন্ন: এক অনন্য আধ্যাত্মিক মহাযজ্ঞ

নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ঘেরা সজীবতা আর রাঙ্গুনিয়ার গুমাইবিলের দিগন্তজোড়া মাঠের মাঝে যেন নেমে এসেছিল এক টুকরো স্বর্গীয় আভা। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়মনগরে অবস্থিত বুদ্ধ মহাধাতু চৈত্য বিহারে গত ১৬ ও ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে উদযাপিত হলো স্মরণকালের এক বিশাল ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক উৎসব। বিশ্বরত্ন, ষড়ভিজ্ঞ "অরহৎ অনুবুদ্ধ" পরম কল্যাণ মিত্র ভদন্ত শীলানন্দ মহাস্থবির (ধুতাঙ্গ ভান্তে)-এর সান্নিধ্যে ৫ শতাধিক বৌদ্ধ কুলপুত্রের প্রব্রজ্যা গ্রহণ এবং ষষ্ঠ দানোত্তম কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানটি বৌদ্ধ সমাজের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আধ্যাত্মিকতার নতুন দিগন্ত: ৫০০ কুলপুত্রের প্রব্রজ্যা
এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল গণ-প্রব্রজ্যা। বুদ্ধের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ৫০০ জন বৌদ্ধ যুবক ও কিশোর জাগতিক মায়া ত্যাগ করে পীত চীবর ধারণ করেন।
কেন এই আকর্ষণ: প্রব্রজ্যাপ্রার্থীদের অনেকের মতেই, ধুতাঙ্গ ভান্তের কঠোর তপোময় জীবন এবং তাঁর অমৃতময় ধর্মদেশনা তাদের এই পথে উদ্বুদ্ধ করেছে।
প্রস্তুতি: এক মাস আগে থেকেই প্রব্রজ্যাপ্রার্থীরা নির্দিষ্ট বিহারগুলোতে নাম নিবন্ধন করেছিলেন এবং অনুষ্ঠানের দিন ভোরে মস্তক মুণ্ডন ও শুদ্ধ হয়ে তাঁরা বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন।
২৪ ঘণ্টায় চীবর বুনন: বেইন শিল্পীদের বিরল নৈপুণ্য
কঠিন চীবর দানের মূল বৈশিষ্ট্য হলো তুলা থেকে সুতা তৈরি করে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চীবর (ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্র) তৈরি করে দান করা।
ঐতিহ্য: খাগড়াছড়ি থেকে আগত দক্ষ বেইন শিল্পীরা চরকায় সুতা কেটে, সেই সুতা বুনন করে এবং প্রাকৃতিক রঙে রাঙিয়ে এক অভাবনীয় প্রক্রিয়ায় চীবর তৈরি সম্পন্ন করেন।
উদ্যোগ: আধুনিক এই যুগেও প্রাচীন বৌদ্ধিক ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতে শিল্পীদের এই কর্মযজ্ঞ দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে।
ধুতাঙ্গ ভান্তের সান্নিধ্য ও বিহারের মাহাত্ম্য
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধ মহাধাতু চৈত্য বিহারটি আজ দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে এক পরম পবিত্র তীর্থস্থান। বিহারের স্থাপত্যশৈলী এবং পারিপার্শ্বিক শান্তি মানুষকে টানে।
"বিগত ১২ বছর ধরে ১৩ প্রকার কঠিন ধুতাঙ্গ শীল পালনকারী শীলানন্দ মহাস্থবিরের উপস্থিতিতে এই প্রব্রজ্যা গ্রহণ করা ভাগ্যের ব্যাপার।" — অনুষ্ঠানে আসা একজন প্রব্রজ্যাপ্রার্থী।
অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণসমূহ
দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনে কেবল চীবর দান বা প্রব্রজ্যা নয়, ছিল আরও বিচিত্র ধর্মীয় অনুষঙ্গ:
বুদ্ধ প্রতিবিম্ব জীবন্যাস: বুদ্ধ মূর্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠা।
কল্পতরু দান: বৌদ্ধ শাস্ত্রীয় বিশ্বাস মতে স্বর্গীয় বৃক্ষ 'কল্পতরু' সাজিয়ে বিশেষ দান।
অষ্টপরিষ্কার ও সংঘদান: ভিক্ষুসংঘকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও খাদ্য দান।
ধর্মসভা: ধুতাঙ্গ ভান্তের গভীর ও জীবনমুখী দেশনা শুনতে উপস্থিত হয়েছিলেন হাজার হাজার পুণ্যার্থী।
আয়োজকদের নিরলস পরিশ্রম
উদ্‌যাপন কমিটির সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এমনকি বিদেশ থেকেও আসা হাজারো দর্শনার্থীর আবাস ও খাবারের সুব্যবস্থা ছিল চোখে পড়ার মতো। রাঙ্গুনিয়ার গুমাইবিল এলাকাটি এই কয়েক দিন পরিনত হয়েছিল বিশ্বশান্তির এক মিলন মেলায়।
উপসংহার
বুদ্ধ মহাধাতু চৈত্য বিহারের এই আয়োজন কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি ত্যাগ, সংযম এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ৫০০ জন প্রব্রজ্যাপ্রার্থীর মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মের মহান বাণী যেমন ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনি কঠিন চীবর দানের ঐতিহ্যও পেয়েছে নতুন এক মাত্রা। এই মহতী পুণ্যময় কাজ সমগ্র জগতের প্রাণীকুলের মঙ্গলের জন্য এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে বিবেচিত হবে।
#বুদ্ধমহাধাতুচৈত্য #গণপ্রব্রজ্যা #কঠিনচীবরদান #বৌদ্ধধর্ম #রাঙ্গুনিয়া #ধুতাঙ্গভান্তে

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো * চিহ্নিত।