চট্টগ্রামে অপরাধের লাগামহীন দৌরাত্ম্য: ফ্লাইওভার থেকে সড়কে অনিরাপদ নগরবাসী
টেলিগ্রাফ প্রতিনিধি,চট্টগ্রাম
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে গত ছয় মাসে ছিনতাই, ডাকাতি, এবং অন্যান্য অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে, যা নগরবাসীকে রীতিমতো আতঙ্কে ফেলেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জনবল সংকটের কথা বলা হলেও, ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন এলাকায় অপরাধের নতুন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
ফ্লাইওভারগুলো এখন অপরাধের ‘হটস্পট’
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের চারটি ফ্লাইওভার এবং একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে অপরাধের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। রাতে এই উড়ালসড়কগুলোতে যানবাহনের গতি কমিয়ে অস্ত্রের মুখে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত সড়কবাতি না থাকা এবং যথাযথ তদারকির অভাবে এই স্থানগুলো অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কর্তৃপক্ষ জানায়, ফ্লাইওভারের বৈদ্যুতিক বাতি, কেবল এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশ নিয়মিত চুরি হয়ে যাচ্ছে। এতে মেরামত করা হলেও বারবার একই স্থানে চুরির কারণে বাতি জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম যদিও নিয়মিত সংস্কার কার্যক্রম চালানোর দাবি করেছেন, তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সড়কবাতি না থাকা, ট্রাফিক সাইন নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং ছিনতাইয়ের ভয়ে অনেক চালক এখন ফ্লাইওভার এড়িয়ে চলছেন।
পুলিশের তৎপরতা ও সীমাবদ্ধতা
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) বলছে, সীমিত জনবল নিয়েই তারা অপরাধ দমনের চেষ্টা করছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে এবং এলাকাভিত্তিক 'সিটিজেন ফোরাম' গঠন করে তারা জনগণের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। রমজান মাসসহ বিভিন্ন সময়ে শপিং মল ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে বাড়তি টহলও দেওয়া হয়েছে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো তথ্য এবং বাস্তবতার মধ্যে ফারাক রয়েছে। সিএমপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই মাসে মাত্র ১৫টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। অনেকে অভিযোগ করছেন, ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে জিডি বা মামলা করতে গেলেও পুলিশ তাতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তার কারণে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি এক বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একজন নারী আইনজীবী বলেন, "আমি আইনজীবী হয়েই যখন ছিনতাইকারীর হাত থেকে রক্ষা পাইনি, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা তো বিলাসিতা।"
আইন হাতে নিচ্ছে জনগণ
ছিনতাইকারীদের লাগামহীন দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষ এখন আইন হাতে তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ষোলশহরে ছিনতাইয়ে জড়িত তিনজনকে ধরে গণপিটুনি দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এর আগেও বারেক বিল্ডিং এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধরতে গিয়ে দুই পুলিশ সদস্য দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছিলেন।গত পরশু চট্টগ্রামের আসকারদীঘীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত আনসার বাহিনীর কোয়ার্টারের সামনে থেকে একজন মহিলা ব্যবসায়ীর মোবাইল ও ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায়।এছাড়াও আজকে কোতোয়ালি থানার পাশে ছোট মেট্রো বাসের ভিতরে থেকে মোবাইল টান দিয়ে নিয়ে যায়, এসময় শেয়ারবিজের এই প্রতিনিধিও ঘটনা স্থলে প্রত্যক্ষদর্শী ছিলো এবং বাসের ভিতরে থাকা লোকজন বলেছেন, ঘটনার সময় মোবাইল টান মেরে ছিনতাইকারী দ্রুত নেমে যায় গাড়ি থেকে। তখন সবাই গাড়ি থামাতে বললেও চালক জোরে গাড়ি চালিয়ে অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দেয় ভুক্তভোগী মোবাইল ছিনতাই হওয়া লোকটিকে।আর এতেই গাড়ি চালক ও সহকারী দুজনের ছিনতাই কারী গ্রুপের সাথে সম্পর্ক আছে বুঝা যায়।অথচ পাশেই ছিল থানা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যক্তি বলেন, প্রতিদিন চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্পটে বিভিন্ন স্টাইলে ছিনতাই হচ্ছে বিশেষ করে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট, কোতোয়ালি, লালদিঘী এবং আসকারদীঘী এলাকায় এসব ঘটনা বেশি হচ্ছে।
এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, পুলিশের উপস্থিতি বা ক্ষমতাকে আর পরোয়া করছে না অপরাধীরা। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের মতে, ছিনতাইকারীদের অধিকাংশই ভাসমান শিশু-কিশোর ও তরুণ, যারা মাদকাসক্ত। তারা নিউমার্কেট, ষোলশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় দলবদ্ধ হয়ে অপরাধ করছে।
সর্বোপরি, এই ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেবল চট্টগ্রামের নয়, সারা দেশেরই একটি প্রতিচ্ছবি। এই অবস্থার নিরসনে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক বলে মনে করছেন সাধারণ জনগণ।
মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো * চিহ্নিত।