ব্যাংক খাতে এস আলমের মহা কেলেংকারি: ১০৪৭৯ কোটি টাকা 'ঋণ-লুট' কাণ্ডে তোলপাড়
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
দুদকের ইতিহাসের বৃহত্তম মামলা; স্ত্রী, ৫ ভাই ও ব্যাংকারসহ ৬৭ জন আসামি
দেশের ব্যাংক খাতে ঘটে যাওয়া অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় পর্দা উন্মোচিত হলো। চট্টগ্রামের আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম (এস আলম), তার স্ত্রী, ও পাঁচ ভাইসহ মোট ৬৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (আইবিবিএল) থেকে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সফটওয়্যার কারসাজির মাধ্যমে ১০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার। দুদকের ইতিহাসে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় অংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা।
যেভাবে ঘটলো এই 'মহা জালিয়াতি'
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও মামলার এজাহার পর্যালোচনায় এই বিশাল অংকের অর্থ আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর চিত্র ফুটে উঠেছে। পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে আইটি বিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত।
২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকেই মূলত এই অনিয়মের সূত্রপাত। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, বিনিয়োগ প্রশাসন এবং গুরুত্বপূর্ণ আইটি বিভাগে নিজের আত্মীয় ও অনুগত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়ে প্রভাব বলয় তৈরি করেন।
আসামিরা পরস্পর যোগসাজশ করে ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবিধি ও নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান।
এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ঋণসীমা ২,৪০০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৩,৮০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়, যা ব্যাংকের মোট মূলধনের ৩৫ শতাংশ অতিক্রম করে—এটি একক গ্রাহক ঋণসীমার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সিআইবি রিপোর্টে ঋণগ্রহীতা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ঋণ ঝুঁকি মূল্যায়ন স্কোর ৫০ শতাংশের নিচে থাকা সত্ত্বেও ঋণ বৃদ্ধি করা হয়।
ব্যবসায়িক আয় সন্তোষজনক না থাকা এবং জামানতের অনুপাত মাত্র ৪০-৭০ শতাংশ হওয়ার পরও এই বিপুল অংকের ঋণ নবায়ন ও বৃদ্ধি করা হয়, যা ব্যাংক ও আমানতকারীদের অর্থকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
এই জালিয়াতিতে বড় ভূমিকা রাখে ব্যাংকের আইটি বিভাগের কারসাজি। সাবেক ডিএমডি তাহের আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে আইসিটিডব্লিউ শাখার 'টর্চ' (Torch) সফটওয়্যার 'ম্যানিপুলেশন' করা হয়। এর মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে ঋণসীমা বৃদ্ধি ও মেয়াদ পরিবর্তন করে প্রায় ৫,৯০০ কোটি টাকা বেআইনিভাবে স্থানান্তর করা হয়।
দুদক জানায়, ১৩৪টি ঋণের মাধ্যমে মোট ৯,২৮৩.৯৩ কোটি টাকা প্রথমে বিভিন্ন নামমাত্র প্রতিষ্ঠানে (যেমন: আহসান এন্টারপ্রাইজ, ইমপ্রেস কর্পোরেশন, অ্যাপারচার ট্রেডিং) স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে সেই অর্থ এস আলম গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মূল প্রতিষ্ঠান যেমন— সোনালী ট্রেডার্স, গ্লোবাল ট্রেডিং কর্পোরেশন, এস এস পাওয়ার, এস আলম স্টিলস এবং এস আলম সিমেন্টের হিসাবে জমা করা হয়।
সিঙ্গাপুরে পাচারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ
দুদক তাদের অনুসন্ধানে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট গতিবিধিও শনাক্ত করেছে। উদাহরণস্বরূপ,
২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার এস আলম ট্রেডিং কোম্পানির হিসাব থেকে ৩৭ কোটি টাকা রূপালী ব্যাংকের ওআর নিজাম রোড শাখার গ্লোবাল ট্রেডিং কর্পোরেশনে স্থানান্তর করা হয়। এর ঠিক পরদিনই, ওই প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে ২৯০ কোটি টাকার সমপরিমাণ (২৩.৫৮ মিলিয়ন ডলার) ব্যাংক অব চায়নার সিঙ্গাপুর শাখায় এস এস পাওয়ার-১ লিমিটেডের অফশোর অ্যাকাউন্টে পাচার করা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় আসামিরা জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে মোট ৯,২৮৩.৯৩ কোটি টাকা (যা বর্তমানে সুদ-আসলে ১০,৪৭৯.৬২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে) আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেছেন বলে দুদক মনে করছে।
কারা এই ৬৭ জন?
এই মহাযজ্ঞে এস আলম পরিবারের সদস্যরাই নন, জড়িয়ে আছেন ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তারাও।
মূল আসামি সাইফুল আলম (এস আলম), তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং পাঁচ ভাই—মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ হাসান, আব্দুস সামাদ, ওসমান গনি, রাশেদুল আলম ও সহিদুল আলম সহ
ব্যাংকের শীর্ষ কর্তা হিসেবে যারা রয়েছেন যথাক্রমে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নাজমুল হাসান, সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল মতিন, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহবুব উল আলম, মোহাম্মদ মনিরুল মাওলা, মো. আবদুল হামিদ মিয়া এবং বর্তমান এমডি ওমর ফারুক খানসহ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী ও আইটি কর্মকর্তারা।
দুদকের এই মামলা ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতিহাসের বৃহত্তম এই আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্ত এখন কোন দিকে গড়ায় এবং আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া কতটা সফল হয়, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো * চিহ্নিত।