প্রতিবেদক - | বৃহস্পতিবার, ২০২৬ জানুয়ারী ০৮, ০৯:৪০ অপরাহ্ন
চট্টগ্রাম আদালতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র চরমে
চট্টগ্রাম আদালতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র চরমে

চট্টগ্রাম আদালতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র চরমে

প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম 


দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের আদালত যেন বিচারপ্রার্থীদের জন্য সুবিচারের ঠিকানা না হয়ে ভোগান্তির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মামলা জট, অবকাঠামোগত সংকট, দুর্নীতি এবং বিচারক স্বল্পতার মতো নানা সমস্যায় জর্জরিত এই বিচারালয়। বছরের পর বছর ধরে চলা এসব সমস্যা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার বিঘ্নিত হচ্ছে।
মামলা জট ও বিচারিক বিলম্ব
চট্টগ্রাম আদালত বর্তমানে লক্ষাধিক মামলার ভারে জর্জরিত। বছরের পর বছর ধরে মামলাগুলো বিচারাধীন থাকায় বিচারপ্রার্থীরা হতাশায় ভুগছেন।  জানা যায়, দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রতা বিচারব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। সময়মতো সাক্ষী হাজির না হওয়া, বিচারকের স্বল্পতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় ধীরগতির কারণে অনেক সময় মামলা নিষ্পত্তি হতে এক যুগ বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এতে করে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি যেমন বিলম্বিত হচ্ছে, তেমনি বিচারপ্রার্থী মানুষের আর্থিক ও মানসিক ভোগান্তি বাড়ছে।
অবকাঠামোগত সংকট ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ
চট্টগ্রাম আদালত ভবনের অবকাঠামো অত্যন্ত নাজুক। পুরানো ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত এজলাস কক্ষ নেই, আইনজীবীদের বসার জায়গা অপ্রতুল এবং বিচারপ্রার্থীদের জন্য কোনো বিশ্রামাগার বা সুযোগ-সুবিধা নেই। এছাড়া, ভবনগুলোর ভেতরে ও বাইরে অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখা যায়। বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক বিচারপ্রার্থীদের জন্য এটি এক বড় সমস্যা।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিচারপ্রার্থী বলেন ,দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে বা রোদে বসে অপেক্ষা করতে হয় আমাদের।
এছাড়াও দুর্নীতি ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য
চট্টগ্রাম কোর্টে দুর্নীতি একটি ওপেন সিক্রেট। আদালতপাড়ায় একটি শক্তিশালী দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা বিচারপ্রার্থীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ফাইল সরাতে ঘুষের লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এই চক্র।সূত্রে আরো জানা যায়,কিছু অসাধু কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই দালালচক্র নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা বিচারব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
বিচারক ও জনবল সংকট
মামলা জটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিচারকের অপ্রতুলতা। চাহিদার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় একজন বিচারককে অতিরিক্ত মামলার বোঝা বহন করতে হয়। এর পাশাপাশি, সহকারী বিচারক, পেশকার ও অন্যান্য প্রশাসনিক পদেও জনবল সংকট রয়েছে। এই জনবল ঘাটতির কারণে বিচারিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে মামলার নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ঘটায়।
সামগ্রিক ভোগান্তি ও সমাধান
চট্টগ্রাম আদালতের এসব সমস্যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। সময়মতো বিচার না পাওয়া, দালালদের হাতে প্রতারিত হওয়া এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অপেক্ষা করা—এগুলো বিচারপ্রার্থীদের মানসিক চাপ ও আর্থিক ক্ষতির কারণ। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, আদালতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মিলতে পারে।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো * চিহ্নিত।