চট্টগ্রামের কেইপিজেড নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ বাড়ছে
অসীম বিকাশ বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) কেবল একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং এটি স্থানীয়দের কাছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক নতুন স্বপ্ন। প্রায় ৩৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে উৎপাদন করছে এবং আরও ১৬টি প্রতিষ্ঠান আগামী ৬ মাসের মধ্যে যুক্ত হবে, যা প্রায় ২৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। তবে, এই বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার আড়ালে লুকিয়ে আছে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ আর হতাশার এক ভিন্ন চিত্র।
বিভিন্ন সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, কেইপিজেডে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলো মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত:
নিয়োগে স্থানীয়দের অবহেলা: স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন মহল থেকে বারবার অভিযোগ আসছে যে, কেইপিজেডে চাকরির ক্ষেত্রে আনোয়ারা উপজেলার শিক্ষিত বেকার যুবকদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে পুরুষদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে অভিজ্ঞতাকে প্রধান শর্ত হিসেবে দেখিয়ে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য স্থানীয় প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়, যা এক ধরনের "নিয়োগ বাণিজ্য" বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেন: স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেইপিজেডে চাকরি পেতে হলে প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ বা মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হচ্ছে। এর ফলে, প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং বাইরের জেলা বা থানা থেকে আসা ব্যক্তিরা চাকরি পাচ্ছেন। এতে আনোয়ারা উপজেলার হাজার হাজার অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী বেকার যুবক হতাশা ও ক্ষোভে ফুঁসছেন।
তবে, এসব অভিযোগের বিপরীতে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষের নিজস্ব যুক্তিও রয়েছে। তারা দাবি করে যে, কেইপিজেডে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কর্মরত, যার মধ্যে প্রায় ৮০% নারী শ্রমিক। কর্তৃপক্ষের মতে, স্থানীয়দের সব সময়ই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কেইপিজেডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার থাকলেও বাইরে থেকে আসা কর্মীদের সংখ্যা সীমিত।
কেইপিজেড: একটি মিশ্র চিত্র
কেইপিজেড নিয়ে আলোচনা করলে কেবল নিয়োগ বিতর্কই সামনে আসে না, বরং এর ইতিবাচক দিকগুলোও উঠে আসে।
নারীর ক্ষমতায়ন: বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কেইপিজেড আনোয়ারার নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। অনেক নারী এখন নিজেদের পরিবারের ভরণপোষণ করছেন, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছেন এবং যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করছেন।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: কেইপিজেডের শ্রমিকদের আয়ের মাধ্যমে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা স্থানীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে আনোয়ারা-কর্ণফুলী অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা স্থানীয়দের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
বিনিয়োগ আকর্ষণ: কেইপিজেড বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখানে বিদেশি কোম্পানিগুলো নিয়মিত বিনিয়োগ করছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
জনমনের ক্ষোভ ও উত্তেজনার কারণ:
এতসব ইতিবাচক দিকের পরেও কেইপিজেডকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে, যার মূল কারণ হলো বৈষম্য ও অস্বচ্ছতা। আনোয়ারা উপজেলার মতো একটি দরিদ্র উপজেলায়, যেখানে শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছে, সেখানে স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের চাকরির ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হলে জনমনে হতাশা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এই ক্ষোভ ভবিষ্যতে বড় ধরনের আন্দোলনের রূপ নিতে পারে বলেও অনেকে আশঙ্কা করছেন।
কেইপিজেড কর্তৃপক্ষের উচিত এই অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা। কেবল অস্বীকার না করে, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্থানীয়দের জন্য চাকরির কোটা নির্ধারণ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা এবং মেধার ভিত্তিতে যোগ্যদের অগ্রাধিকার দিলে হয়তো এই ক্ষোভ প্রশমিত হতে পারে।
মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো * চিহ্নিত।